
বৃহস্পতিবার দিনের শুরুতে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ECB) মুদ্রানীতি বৈঠকের আগে সতর্ক মনোভাব বাজারের গতি কমিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে, ওয়াল স্ট্রিটের আগের আশাবাদ কমে যাওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইতিবাচক অর্থনৈতিক তথ্য প্রকাশের পর এই প্রভাব দেখা যাচ্ছে। তবে, ফেডের কাছ থেকে আগেভাগে সুদের হার কমানোর প্রত্যাশা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হলে ভবিষ্যতে গ্রিনব্যাকের দর কমে যাওয়ার আশঙ্কায় US Dollar Index (DXY) এখনও চাপে রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের জয়ের সম্ভাবনাও বেড়েছে।
মার্কিন ডলারের সামগ্রিক দুর্বলতা এবং ECB-এর সুদের হার অপরিবর্তিত রেখে কড়া অবস্থান বজায় রাখার সম্ভাবনা বাড়ায় EURUSD ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। এদিকে, যুক্তরাজ্যের মিশ্র কর্মসংস্থান প্রতিবেদনের পরও ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের (BoE) সুদের হার নিয়ে কড়া অবস্থানের প্রত্যাশায় GBPUSD বছরের সর্বোচ্চ স্তরের কাছাকাছি ওঠানামা করছে। বহু দিনের সর্বনিম্ন স্তরে জাপানের মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপের চাপ সামলাচ্ছে USDJPY।
AUDUSD ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করছে, তবে পণ্যবাজারে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে মিশ্র মনোভাবের কারণে আসন্ন উদ্বেগের মধ্যে US Dollar দুর্বল হলেও NZDUSD ও USDCAD তাতে ইতিবাচক সাড়া দিতে পারছে না।
প্রত্যাশার চেয়ে বেশি পরিমাণে মজুত কমে যাওয়ায় অপরিশোধিত তেল সপ্তাহের লোকসানের কিছুটা পুষিয়ে নিচ্ছে, তবে চীনের উদ্বেগ জ্বালানি ক্রেতাদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এদিকে, দুই মাসের বিরতির পর চীনের পিপলস ব্যাংক (PBoC) আবার সোনা কেনা শুরু করবে—এমন একটি প্রতিবেদন এবং US Dollar-এর দুর্বলতা XAUUSD-এ ক্রেতাদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সাহায্য করেছে।
আগের দিন দৈনিক ক্লোজ নেতিবাচক হলেও BTCUSD ও ETHUSD—দুটিই টানা দ্বিতীয় সপ্তাহে লাভের পথে রয়েছে। এর ফলে, শীর্ষস্থানীয় ক্রিপ্টোকারেন্সি পেয়ারগুলো মঙ্গলবার Ethereum ETF চালুর সম্ভাবনার আগে আশাবাদের পক্ষে যুক্তি জোগাচ্ছে। পাশাপাশি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের সম্ভাবনা বাড়ায় ট্রেডিংয়ের জন্য আরও অনুকূল নীতির প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছে।
প্রধান অ্যাসেটগুলোর সর্বশেষ দর ওঠানামা নিচে দেওয়া হলো:



জুনে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প উৎপাদন ও আবাসন বাজারের পরিসংখ্যান আশাব্যঞ্জক হলেও, মার্চের পর সর্বনিম্ন স্তর পরীক্ষা করার সময় US Dollar Index (DXY) পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে এক দিনে সবচেয়ে বড় পতন রেকর্ড করেছে। এতে ছয়টি প্রধান মুদ্রার বিপরীতে ডলারের অবস্থান দুর্বল ফেডের বক্তব্য এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার চাপে পড়েছে।
বুধবার নিউইয়র্ক ফেডের প্রেসিডেন্ট জন উইলিয়ামস ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে (WSJ) বলেন, “আগামী কয়েক মাসে সুদের হার কমানো যুক্তিযুক্ত হতে পারে।” একই সুরে, সম্ভাব্য পরিস্থিতিগুলোর বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ফেডের গভর্নর ক্রিস্টোফার ওয়ালারও বলেন, সুদের হার কমানোর সময় ঘনিয়ে আসছে। এদিকে, রিচমন্ড ফেডের প্রেসিডেন্ট থমাস বারকিন বলেন, “25 বেসিস পয়েন্ট সুদের হার কমানো একদিকে বা অন্যদিকে কোনো বিষয় নয়; মূল প্রশ্ন হলো, বয়ান বদলানোর সময় কখন।”
উল্লেখযোগ্য যে, ফেডের মাসিক Beige Book-এ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি কমে আসা এবং যেসব ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি থমকে যাচ্ছে বা কমছে, সেসবের ক্রমবর্ধমান ইঙ্গিতের কথা বলা হয়েছে।
রাজনৈতিকভাবে, স্বাস্থ্যগত কারণে বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট Joe Biden-কে নির্বাচনী দৌড় থেকে সরে দাঁড়ানোর চাপ বাড়ছে। এতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী Donald Trump-এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। একই সঙ্গে, US-China উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং US Dollar-এর অবমূল্যায়নের সম্ভাবনাও জোরালো হচ্ছে।
মার্কিন ডলারের দরপতনের সঙ্গে অন্যান্য অঞ্চলের বেশিরভাগ ইতিবাচক প্রভাব মিলে অন্য প্রধান মুদ্রাগুলোকে এগিয়ে দিয়েছে। তবে ওয়াল স্ট্রিটের সংশোধনমূলক দরপতন আশাবাদীদের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
EURUSD-এর কথা বলতে গেলে, প্রাথমিক পূর্বাভাস অনুযায়ী জুনে ইউরোজোনের মূল্যস্ফীতি অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনা, ECB প্রেসিডেন্ট Christine Lagarde-এর কড়া অবস্থানের ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যের প্রত্যাশা এবং ফেডের নীতিতে সম্প্রতি নরম অবস্থানের প্রত্যাশা বেড়ে যাওয়া—সব মিলিয়ে EURUSD-এর দাম চার মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের ইতিবাচক মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশের পর ট্রেডাররা আগস্টে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের (BoE) সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা নিয়ে প্রত্যাশা কমালে GBPUSD 2023 সালের জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। উল্লেখযোগ্য যে, আজ যুক্তরাজ্যের মিশ্র কর্মসংস্থান প্রতিবেদন এবং মার্কিন ডলারের সংশোধনমূলক উত্থান—দুটিই বার্ষিক সর্বোচ্চ পর্যায়ে বুলদের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
জাপানের শীর্ষ মুদ্রা-বিষয়ক কূটনীতিক Masato Kanda Kyodo News-কে বলেছেন, “FX বাজারে স্পেকুলেটররা অতিরিক্ত ওঠানামা ঘটালে, যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় থাকে না।” এতে বাজারের এই বিশ্বাস আরও জোরালো হয়েছে যে টোকিও মার্কিন ডলারের দরপতনের সুযোগ নিয়ে ইয়েনের আগের লোকসান কিছুটা পুষিয়ে নিচ্ছে। এদিকে, জুনে জাপানের দুর্বল বাণিজ্য পরিসংখ্যানের কারণে USDJPY ছয় সপ্তাহের সর্বনিম্ন অবস্থান থেকে সংশোধনমূলকভাবে ঘুরে দাঁড়ায়, তবে ইউরোপীয় সেশন শুরুর আগে বিক্রেতারা আবার সক্রিয় হন।
অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও কানাডার ডলারকে ব্যতিক্রম বলে মনে হচ্ছে। চীনের সমস্যার মধ্যে মার্কিন ডলারের বিপরীতে সাপ্তাহিক লোকসানের পথে রয়েছে মুদ্রাগুলো। তবে অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার মিশ্র কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতির তথ্য সুদের হার কমানোর পক্ষে যুক্তি জোরালো করেছে। অন্যদিকে, আরও সুদের হার বাড়ানোর বিষয়ে রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউজিল্যান্ডের (RBNZ) দ্বিধা এবং নিউজিল্যান্ডের (NZ) বেশিরভাগ দুর্বল পরিসংখ্যান NZDUSD-কে চাপে ফেলেছে।
অ্যান্টিপোডিয়ান মুদ্রাগুলোর পাশাপাশি ক্রুড অয়েলও সাপ্তাহিক লোকসানের পথে রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সাপ্তাহিক ক্রুড অয়েল ইনভেন্টরি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি কমায়, মাসিক সর্বনিম্ন থেকে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
চীনের বিপুল পরিমাণ সোনা কেনার প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেওয়া প্রতিবেদনগুলোর মধ্যে আগের দিন রেকর্ড করা সর্বোচ্চ দামের কাছাকাছি সোনার দাম চাঙা রয়েছে। বুধবার রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে চীনের এক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নীতিনির্ধারকের বরাতে বলা হয়, তাঁরা রিজার্ভে সোনার পরিমাণ 4.9% থেকে বাড়িয়ে 10% করতে চান। বর্তমান দামে এর জন্য আরও 170 বিলিয়ন ডলারের সোনা কিনতে হবে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, “এ পরিমাণ যেকোনো বছরে বিশ্বজুড়ে খনন করা সোনার প্রায় 70%—অর্থাৎ 70 মিলিয়ন আউন্স। এর তুলনায় গত বছর চীন কিনেছিল 7 মিলিয়ন আউন্স।”
বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংকের (ECB) মুদ্রানীতি সংক্রান্ত ঘোষণার দিকে সবার নজর থাকবে, যদিও ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে যে আঞ্চলিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকটি নীতিমালায় কোনো পরিবর্তন আনবে না। বাজারের উদ্বেগের কারণ হতে পারে ইউরোজোনের সাম্প্রতিক হতাশাজনক ডেটা এবং ECB-র আরেক দফা সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা বেড়ে যাওয়া। নীতিনির্ধারকেরা যদি কড়া অবস্থানের পক্ষের সদস্যদের আশ্বস্ত করতে ব্যর্থ হন, তাহলে একাধিক দিনের সর্বোচ্চ স্তর থেকে ঘুরে EURUSD-এর দাম সাপ্তাহিক লাভের কিছুটা হারাতে পারে।
ECB-র পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের সাপ্তাহিক বেকারত্ব ভাতার দাবির পরিসংখ্যান এবং ফিলাডেলফিয়া ফেড ম্যানুফ্যাকচারিং ইনডেক্সও বাজারের অংশগ্রহণকারীদের মনোযোগের কেন্দ্রে থাকবে। তবে, মার্কিন ডলারকে চাপে রাখতে ফেডের সুদের হার কমানোর পক্ষে আরও প্রমাণের প্রয়োজন হবে। তা না হলে, একাধিক দিনের সর্বনিম্ন স্তরে থাকা ডলার সাপ্তাহিক লোকসানের কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারে।
ট্রেডিংয়ে ভাগ্য আপনার সহায় হোক!