
প্রধান অর্থনীতিগুলোর মিশ্র অর্থনৈতিক তথ্য সুদের হার কমানোর প্রত্যাশার সঙ্গে না মেলায় বাজারে অস্বস্তি দেখা যাচ্ছে। শ্রমবাজার দুর্বল হওয়া, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগ বিনিয়োগকারীদের সতর্ক রাখছে। এ সপ্তাহের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে US Core PCE Price Index এবং ইউরোজোনের মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ধারণা করা হচ্ছে, ফেডারেল রিজার্ভ (Fed) ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংকের (ECB) তুলনায় দ্রুত সুদের হার কমাবে, যা US Dollar-কে প্রভাবিত করবে।
আগস্টের US CB Consumer Confidence সূচক পাঁচ মাসের সর্বোচ্চে উঠলেও মার্কিন ডলারকে শক্তিশালী করতে পারেনি। এর পেছনে আংশিকভাবে কর্মসংস্থানসংক্রান্ত তুলনামূলক দুর্বল তথ্যের ভূমিকা ছিল। Richmond Fed Manufacturing Index-ও প্রত্যাশার তুলনায় কম ছিল, যা ডলারের দুর্বলতা আরও বাড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ দুর্বল অর্থনৈতিক তথ্য ডলারের ওপর চাপ সৃষ্টি করলেও, মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়াকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক উদ্বেগ এবং এ সপ্তাহের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশের আগে সতর্ক মনোভাব ডলারের দরপতন সীমিত রেখেছে।
উল্লেখযোগ্য শিরোনামের মধ্যে রয়েছে ইউক্রেনের দাবির সমালোচনা এবং পশ্চিমা দেশগুলোকে সতর্ক করে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী Sergey Lavrov-এর বক্তব্য; পাশাপাশি ইরানের পক্ষ থেকে ইসরায়েলে সম্ভাব্য হামলার উদ্বেগও রয়েছে। পশ্চিম তীরেও ইসরায়েলি সামরিক কর্মকাণ্ড নজরে রয়েছে।
সরবরাহ নিয়ে চলমান উদ্বেগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের তেলের মজুত অপ্রত্যাশিতভাবে কমে যাওয়া সত্ত্বেও তেলের দাম কমেছে। ট্রেডাররা আনুষ্ঠানিক মজুতের তথ্য ও মূল্যস্ফীতির ইঙ্গিতের অপেক্ষায় থাকায় WTI অপরিশোধিত তেলের টানা তিন দিনের দরবৃদ্ধির ধারা শেষ হয়েছে এবং দাম এখন চাপের মুখে রয়েছে।
বাজারের অনিশ্চয়তার মধ্যে সোনার সাপ্তাহিক দরবৃদ্ধি কিছুটা কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি কমছে এবং শ্রমবাজারে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এতে ফেডের সুদের হার কমানোর প্রবণতা সমর্থন পাচ্ছে, তবে ভবিষ্যতে সুদের হার কমানোর ক্ষেত্রে ফেড ECB-কে ছাড়িয়ে যেতে পারবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগও তৈরি হচ্ছে। ভূরাজনৈতিক উদ্বেগ এবং শেয়ার ও বন্ডের পক্ষে শক্তিশালী বুলিশ সংকেতের অভাবও সোনার দামের ওঠানামা সীমিত করছে।
ছয়টি প্রধান মুদ্রার বিপরীতে US Dollar-এর মান পরিমাপের সূচক US Dollar Index (DXY) 2023 সালের জুলাইয়ের পর সর্বনিম্ন স্তরে নেমে ক্ষতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। ট্রেডাররা যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির শক্তিশালী তথ্যের প্রত্যাশা করছেন, আর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি মন্দায় না পড়ে ধীরে ধীরে গতি কমিয়ে আনতে পারবে—এমন সম্ভাবনাও কমে এসেছে। মাসের শেষের সমন্বয়ের মধ্যে ঝুঁকিবিরোধী শিরোনাম এবং শেয়ার ও বন্ড বাজারের অনিশ্চিত গতি ডলারের সূচকের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করছে।
মার্কিন ডলার দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও EURUSD-এর বুলরা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। জার্মানির মিশ্র তথ্য এবং ইউরোজোনে মূল্যস্ফীতি কমার সম্ভাবনা ECB কর্মকর্তাদের আরও সুদের হার কমানোর ইঙ্গিতপূর্ণ নরম অবস্থানের বক্তব্যকে সমর্থন করছে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী Keir Starmer-এর নেতিবাচক মন্তব্য—যেখানে তিনি অক্টোবরে ‘কষ্টকর’ বাজেটের ইঙ্গিত দিয়েছেন—GBPUSD-এর দামে প্রতিফলিত হচ্ছে না। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যের CBI Distributive Trades সূচকের উন্নতি হয়েছে এবং Bank of England (BoE)-এর কর্মকর্তারাও hawkish মন্তব্য করেছেন।
USDJPY সাম্প্রতিক দরপতনের কিছুটা পুষিয়ে নিয়েছে। BOJ-এর ডেপুটি গভর্নর রিওজো হিমিনোর মিশ্র মন্তব্যের মধ্যে 13 মাসের পুরোনো ঊর্ধ্বমুখী সাপোর্ট লাইনে ঠেকার পর এটি ঘুরে দাঁড়ায়। নীতিনির্ধারক জানান, জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়াতে প্রস্তুত। তবে তিনি এও জোর দিয়ে বলেন, সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে তথ্য-উপাত্তের ওপর।
জুলাইয়ে অস্ট্রেলিয়ার মাসিক কনজিউমার প্রাইস ইনডেক্স (CPI) পূর্বাভাসের চেয়ে ভালো আসায় AUDUSD 2024 সালের জানুয়ারির পর থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। তবে, ট্রিমড CPI এবং অস্থির পণ্য বাদে CPI-এর বিস্তারিত তথ্য অস্ট্রেলিয়ার রিজার্ভ ব্যাংকের (RBA) কড়া নীতির পক্ষপাতকে ততটা সমর্থন করেনি। এর ফলে পরে কোটটি কয়েক মাসের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নেমে আসে।
একই ধারায়, NZDUSD-তেও 2024 সালের জানুয়ারির পর থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠার পর আর ঊর্ধ্বমুখী গতি নেই। তবে, RBA-এর তুলনায় নিউজিল্যান্ডের রিজার্ভ ব্যাংক (RBNZ) নিয়ে বাজারের নীতিগত অবস্থান বেশি কড়া হওয়ায়, কিউই পেয়ারটি অস্ট্রেলিয়ান ডলারের তুলনায় এখনও বেশি দৃঢ় রয়েছে।
এদিকে, মার্চের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকা USDCAD-এর টানা তিন দিনের পতন থেমেছে। কানাডার প্রধান রপ্তানি পণ্য অপরিশোধিত তেলের দামে সাম্প্রতিক দুর্বলতা এবং গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন তথ্য প্রকাশের আগে মার্কিন ডলারের সংশোধনমূলক উত্থান—দুটিই এতে ভূমিকা রেখেছে।
মঙ্গলবার Bitcoin (BTCUSD) এবং Ethereum (ETHUSD)-এর দাম তিন সপ্তাহের মধ্যে এক দিনে সবচেয়ে বেশি কমেছে। এই পতন US নির্বাচন নিয়ে ক্রমবর্ধমান হতাশা এবং মাসের শেষের দিকে ফান্ড থেকে অর্থ বেরিয়ে যাওয়ার প্রতিফলন।



সামনের দিকে তাকালে, শুক্রবার প্রকাশিত হতে যাওয়া ইউরোজোন ও যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির তথ্যের দিকে বাজারের নজর থাকবে। ট্রেডাররা আশা করছেন, সুদের হার কমানোর ক্ষেত্রে ফেডারেল রিজার্ভ ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চেয়ে দ্রুত এগোবে। এর আগে বুধবারের সাপ্তাহিক মার্কিন অপরিশোধিত তেলের মজুতের তথ্য এবং বৃহস্পতিবারের মার্কিন বেকারত্ব ভাতার দাবির তথ্যের পাশাপাশি ইউরোজোনের মনোভাব-সংক্রান্ত তথ্যও বাজারকে ব্যস্ত রাখবে। এ ছাড়া, শুক্রবার ভোরে প্রকাশিতব্য টোকিওর ভোক্তা মূল্য সূচক (CPI), জাপানের বেকারত্বের হার এবং শিল্প উৎপাদনের তথ্যও বাজারের দিকনির্দেশ স্পষ্টভাবে বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে নজরে রাখা উচিত।
জাপানের প্রকাশিত অর্থনৈতিক তথ্য ব্যাংক অব জাপানের (BoJ) হকিশ অবস্থানকে সমর্থন করতে পারে এবং USDJPY-এর ওপর নিম্নমুখী চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে, জুলাইয়ের US Core PCE Price Index বাড়বে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ফেডের পছন্দের মূল্যস্ফীতি সূচকটিতে এই বৃদ্ধি দেখা গেলে এবং বিস্তারিত তথ্য ইতিবাচক থাকলে, সাম্প্রতিক বার্ষিক সর্বনিম্ন থেকে মার্কিন ডলার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। অপরিশোধিত তেলের মজুতের তথ্য সাম্প্রতিক দরবৃদ্ধির পর তেলের দামে সংশোধন ঘটাতে পারে। এদিকে, ECB কর্মকর্তারা আরও সুদের হার কমানোর পক্ষে থাকায় EURUSD স্থিতিশীল থাকবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ইউরোজোনের তথ্যেও উল্লেখযোগ্য বাজার-প্রতিক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা কম।
যুক্তরাষ্ট্রের তুলনামূলক দুর্বল অর্থনৈতিক তথ্য, ফেডের ডোভিশ অবস্থানের পূর্বাভাস এবং বাজারে চলমান অনিশ্চয়তার কারণে সোনার দাম দৃঢ় থাকতে পারে এবং নতুন সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে শেয়ার এবং অস্ট্রেলিয়ান ও নিউজিল্যান্ড ডলারের মতো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অ্যাসেটের পারফরম্যান্স দুর্বল হতে পারে।
ট্রেডিংয়ে ভাগ্য আপনার সহায় হোক!